সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম:
ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল। চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। পানিবন্দী হাজারো মানুষ হারিয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই; চলছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির চরম হাহাকার। এই ঘোর সংকটে ঘরে বসে থাকেনি একদল উদ্যমী তরুণ। বুকভরা মানবিকতা নিয়ে তারা ছুটে গেছেন দুর্গত এলাকার একেবারে প্রান্তিক ও দুর্গম জনপদে, যেখানে এখনো পৌঁছায়নি কোনো সরকারি-বেসরকারি সাহায্য।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার বন্যাকবলিত অঞ্চলে উপহার সামগ্রী (ত্রাণ) নিয়ে সরাসরি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন একদল স্বেচ্ছাসেবী। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ‘গর্জন’ (Gorjownn Swo), ‘ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা-ধরা’ (Dhoritri Rokhhay Amra-DHORA)।
অভিযানের প্রথম ধাপে স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটে যান সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের পুরানগড় ফকিরখিল, হাজিম পাড়া ও মাহালিয়া এলাকায়।
সেখানকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এক স্বেচ্ছাসেবী জানান: “পানির তীব্রতার কারণে একপর্যায়ে আমাদের গাড়ি আর সামনে যেতে পারছিল না। আমরা গাড়ি থেকে উপহার সামগ্রী নিজেদের কাঁধে তুলে নিই। কোথাও কোমর সমান পানি ভেঙে, আবার কোথাও নৌকায় চড়ে আমরা প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরের দুয়ারে গিয়ে উপহার পৌঁছে দিয়েছি।”
এরপর দলটি রওনা হয় বাঁশখালী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্দেশ্যে। সেখানে তারা বাঁশখালী বাংলাবাজার ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং খানকানাবাদ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ত্রাণ বিতরণ করেন।
বাংলাবাজার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। গতকাল স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষী আঞ্জেলা দেবী অঞ্জলের মাধ্যমে বাঁশখালীর রোভার স্কাউট টিমের হিমাদ্রী হোসাইন আবিরের একটি ইউনিটের সাথে যোগাযোগ হয় স্বেচ্ছাসেবীদের। রোভার টিমের গাইডেন্সে তারা এমন সব দুর্গম এলাকায় পৌঁছান, যেখানে ইতিপূর্বে কোনো ত্রাণবাহী গাড়ি বা দল পৌঁছাতে পারেনি।
পথঘাট অচেনা থাকায় স্বেচ্ছাসেবীদের প্রায় ১ কিলোমিটার পথ হাঁটু সমান পানি ভেঙে হেঁটে যেতে হয়। উপহার সামগ্রী হাতে পেয়ে এক বৃদ্ধার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত সবাই। এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন, “সেদিনের সেই অশ্রু ভেজা চোখগুলো দেখার পর আমাদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। মনে হয়েছে আমাদের এই কষ্ট সার্থক।”
বাঁশখালীর খানকানাবাদ এলাকায় প্রবেশের সময় স্বেচ্ছাসেবীদের পড়তে হয় ভিন্ন এক অভিজ্ঞতায়। মাঝপথে কিছু অতি-উৎসাহী স্থানীয় লোক রাস্তার মাঝে গাছ ফেলে গাড়ি আটকে দেয় এবং উপহার সামগ্রী রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট— কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নয়, তারা নিজ হাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরে উপহার পৌঁছে দেবেন।
পরবর্তীতে স্থানীয় কিছু সচেতক মানুষের সহায়তায় তারা একেবারে মূল দুর্গত এলাকায় প্রবেশ করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিগত ৭ দিন ধরে তারা পানিবন্দী থাকলেও এই প্রথম কোনো দল তাদের খোঁজ নিতে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক ব্যক্তি বা সংগঠন রাস্তার পাশে ত্রাণ দিয়ে চলে যাওয়ায় এবং সঠিক গাইড না থাকায় দুর্গম এলাকার প্রকৃত ভুক্তভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছিলেন। কিন্তু এই তরুণ দলটি সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একদম প্রকৃত অসহায় মানুষের কাছে উপহার সামগ্রী পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
এই মানবিক মহাযজ্ঞকে সফল করতে যারা এগিয়ে এসেছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আয়োজকেরা। বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয়েছে উপহার সামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়ানো সংগঠন ‘গর্জন’, এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ‘ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা-ধরা (ধরা)’-কে।
তরুণদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, দুর্যোগ যতই ভয়াবহ হোক না কেন, পারস্পরিক সহানুভূতি ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে যেকোনো বাধা পেরিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
মন্তব্য করুন